রায়পুর প্রতিনিধিঃ লক্ষ্মীপুরে একসময় চলত মরহুম মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ আবু তাহেরের ইন্ধনে। পরে এ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় লক্ষ্মীপুর -২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়নের হাতে। সেখান থেকে শুরু হয় আত্মীয়তার সূত্রে তাহের পরিবারকেও তিনি হাতে রাখেন। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ শাসনামলে পুরো জেলায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে সক্ষম হন নয়ন।
জেলার পাঁচ উপজেলা- লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগরের প্রশাসন এবং দলীয় কর্মকাণ্ড ছিল তার একক নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নিয়োগ, দরপত্র, পরিবহনসহ সর্বস্তরে চাঁদাবাজি, পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্য- সবকিছুতেই ছিল তার একক নির্দেশে। এর মধ্য দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন নয়ন। দেশে-বিদেশে রয়েছে বিপুল সম্পদ। বলাবলি আছে- আওয়ামী লীগের বিগত দিনে লক্ষ্মীপুরে সবচেয়ে বেশি অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি।
টানা গত ১০ বছর ধরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্বে ছিলেন অ্যাডভোকেট নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন। মূলত এরপর থেকেই ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দেখিয়ে জেলার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে আনতে শুরু করেন নয়ন। কুয়েতে গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুর-২ আসনের কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হলে ২০২১ সালের জুনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন এডভোকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও তিনি এমপি হয়েছিলেন। এমপি হওয়ার পর থেকে নয়ন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান নয়ন ও তার অনুসারীরা। ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দুটি মামলাও হয়েছে। এদিকে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতেমাধ্যে সংস্থাটি জানিয়েছে, নয়ন ২০২১ সালে নির্বাচনী হলফনামায় বছরে ৩৬ লাখ ১০ হাজার ২৯০ টাকা আয় এবং ১ কোটি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬৮ টাকার সম্পদ দেখিয়েছিলেন। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর মহিলা কলেজসংলগ্ন ১০ শতাংশ জমিতে বিশাল পাঁচতলা ভবন, ওই এলাকায় ৪০-৫০ শতাংশ জমি এবং ধানমন্ডিসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা যায়। তা ছাড়া লন্ডনে রয়েছে তার ফ্ল্যাট এবং কানাডার বেগমপাড়ায় রয়েছে বাড়ি।
জানা গেছে, টাকার বিনিময়ে নিজস্ব ব্যক্তিদের টেন্ডার পাইয়ে দিতেন ও বাজার দখল, বাসস্ট্যান্ড থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চাঁদা তুলতেন। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অনিয়ম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে প্রভাব খাটিয়ে নিজ এবং তার পক্ষের অন্য ব্যক্তিবর্গের নামে ও তার ওপর নির্ভরশীলদের নামে প্রচুর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হয়েছেন। সব মিলিয়ে তার ঘোষিত সম্পদের বিবরণের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সম্পদের খোঁজ মিলেছে দুদকের গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে।
কে এই নয়ন,ছাত্রলীগের মাধ্যমেই তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ উচ্চ বিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি, ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রলীগের রাজনীতি শেষে ১৯৮৮ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই চমক দেখান এ নেতা। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক,১৯৯৪ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, ২০০৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান তিনি। এরপর ২০১৫ থেকে এখন পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নয়ন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র এমপি নির্বাচিত হয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন ব্যবসায়ী কাজী সহিদ ইসলাম পাপুল। নানা নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হন তিনি। পরে মানবপাচারের দায়ে কুয়েতে গ্রেপ্তার ও সাত বছরের কারাদ- হলে সংসদ সদস্যপদ হারান পাপুল। আওয়ামী লীগের নেতাদের অভিযোগ- পাপুলকে প্রার্থী ও বিজয়ী করার নেপথ্যে ছিলেন এই অ্যাডভোকেট নয়ন। এ জন্য তিনি পাপুলের কাছ থেকে নিয়েছিলেন ৫ কোটি টাকা। পাপুল কুয়েতের কারাগারে বন্দি হলে নয়নের এমপি হওয়ার দরজা খুলে যায়। উপনির্বাচনে পাপুলের স্ত্রী কাজী সেলিনা ইসলাম প্রার্থী হলেও তাকে প্রচারে মাঠে নামতে দেননি নয়নের সমর্থকরা।
নিয়োগবাণিজ্যে ছিলেন তিনি সেরা,এছাড়া এলাকায় আধিপত্য কায়েম করতে পারায় এমপি হওয়ার আগে থেকেই নিয়োগবাণিজ্য নিযন্ত্রণ করেন তিনি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, নিয়োগপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার একটি অংশ পেতেন নয়ন। কয়েকজন শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, তারা চাকরির জন্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। আরও কয়েকজনকেও দিতে হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে প্রার্থীকে সর্বনিম্ন ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। ১০-১২ জন অপরিচিত রিকশা চালক জানান, জেলায় ১৫ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। প্রতিটি অটোরিকশা সড়কে নামে আগে চাঁদা দিতে হয়েছে চার-পাঁচ হাজার টাকা করে। এ ছাড়া প্রতি মাসে এক একটি অটোরিকশাকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চাঁদাবাজির মূলে ছিলেন কুলি চৌধুরী বিরুদ্ধে। তিনি নয়নের ‘ক্যাশিয়ার হিসাবে পরিচিত এবং চাঁদার বড় অংশ যেত তার কোষাগারে। এ খাতে বছরে চাঁদাবাজি হতো প্রায় ১৮-২০ কোটি টাকা। নয়নের ডান হাত বলে পরিচিত রায়পুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী জামশেদ কবীর বাকী বিল্লাহর ‘জলসা ঘর’ নামক অফিসে সব অপকর্মের পরিকল্পনা করা হতো। নয়নকে নিয়মিত দিতেন কোটি টাকার মাসোয়ারা। পাশাপাশি তিনিও হয়েছেন শতকোটি টাকার মালিক।
গত উপজেলা নির্বাচনে নয়ন তার ভগ্নীপতি কে জয় করতে ভূয়া ভোট বানিজ্য করে জয়লাভ করাই তার ভগ্নীপতি অধ্যাপক মামুনুর রশীদ কে।শুধু তায় নয়,দৈনিক গণজাগরণ পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি ভোট কেন্দ্রে জ্বাল ভোট দেওয়া নিয়ে তথ্য দিলে তাকে ছাত্র লীগ ও যুবলীগের নেতাদের দিয়ে অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলা চালায় নয়ন ও বাকী বিল্লাহর নির্দেশে। জনসভায় বাকী বিল্লাহ তার ভাষণে বলেন,নয়ন ভাইয়ের মাইরের কোনো আওয়াজ হয় না, ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়, নয়ন এমপি ইশারা দিলেই সব ধুমা হয়ে যায়।
৫ আগস্টের পর বাকী বিল্লাহও পালিয়ে চলে গেছেন লন্ডনে। ছাত্র লীগ যুবলীগ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মনোনয়ন বাণিজ্য কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জানান, জেলার পাঁচ উপজেলা পরিষদ, ৫৮ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার, চার পৌরসভায় মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী নির্ধারণ করে দিতেন এমপি নয়ন। এ মনোনয়ন দেওয়া হতো টাকার বিনিময়ে। ইউপি বা উপজেলায় নৌকা প্রতীক পেতে দিতে হতো কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা। সোশ্যাল মিডিয়ায় সাংবাদিকদের জিম্মি করে রেখেছে এ নয়ন ও বাকী বিল্লাহ। ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউপির চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুর রশিদ মোল্লার তথ্য সুত্রে জানা যায়, বেশি টাকা না দেওয়ায় তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। অভিযোগ রয়েছে, নয়ন পরে ৫০ লাখ টাকা নিয়ে নৌকার প্রার্থিতা দেন।দলে আত্মীয়করণ ও তাহের পরিবার : নয়ন তার আধিপত্য কায়েম করতে গিয়ে আবু তাহেরের পরিবারকেও সঙ্গে রাখেন নয়ন। তাহেরের মেজ ছেলে সদ্য অপসারিত সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একেএম সালাউদ্দিন টিপুর সদর উপজেলার সব চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন। স্ত্রীর ফুফাতো ভাই টিপু। সে হিসাবে টিপু হলেন নয়নের শ্যালক। আত্মীয়তার সূত্রে সব অনিয়মে একে অপরের সহযোগী হয়ে উঠেন তারা। সরকার পতনের পর টিপুও বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের অপসারিত চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ নয়নের ভগ্নিপতি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশিদ নয়নের বোনের ভাশুর। নয়নের মামা হুমায়ুন কবীর পাটোয়ারী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং চররুহিতা ইউপির চেয়ারম্যান। রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ১০নং রায়পুর ইউপির চেয়ারম্যান শফিউল আজম চৌধুরী (সুমন) নয়নের ছোট শ্যালক। এই আত্মীদের মাধ্যমে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে সবকিছুতে ছিল নয়নের আয়ত্তে।
নয়নের রায়পুর অংশের অস্ত্রধারী ক্যাডার ছিলেন শীর্ষসন্ত্রাসী তানভীর হায়দার রিংকু। ২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে আলোড়িত লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম হত্যা কান্ডে অন্যতম আসামি এই রিংকু। তার নিয়ন্ত্রণে ছিল রায়পুরের বাস ও সিএনজি স্ট্যান্ড। পৌরসভার টেন্ডার ও ইজারার ভাগ-বাটোয়ারার দায়িত্বও ছিল তার উপর। এই রিংকুর মাধ্যমে নয়ন প্রতি মাসে পেত কোটি কোটি টাকা। রিংকু নিজেও হয়েছেন শত শত কোটি টাকার মালিক। নয়নের আরেক সহযোগী নয়নের স্ত্রী জেলা আওয়ামী লীগ নেত্রী লুবনা চৌধুরীর বিরুদ্ধেও স্বামীর প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে অগণিত। ক্ষমতার জোরে তাকে বানানো হয় রায়পুর মহিলা কলেজের গভর্নিং কমিটির সভাপতি।
নয়নের বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ২০২২ সালে লক্ষ্মীপুরে জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিব ইমাম খুনের ঘটনায়ও নয়নের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।সরকার পতনের পরপরই আত্মগোপনে চলে যান অ্যাডভোকেট নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন। যে কারণে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: রাকিব হোসেন সোহেল
কার্যালয় : রুম নং ২১, উত্তর স্টেশন মার্কেট ২য় তলা, লক্ষ্মীপুর
www.lakshmipurerkotha.com